মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. সাঈদ হোসেন বলেন, প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলোর একটি হলো হিট স্ট্রোক। এটি এমন একটি অবস্থা, যা যে কোনো বয়সের মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। তবে হিট স্ট্রোক হঠাৎ করে ঘটে না, এর আগে শরীর নানা ধরনের সংকেত দিতে শুরু করে। এই লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকলে সহজেই বিপদ এড়ানো সম্ভব।
গরমের সময় আমাদের শরীর স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরে রাখতে ঘামের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু অতিরিক্ত গরমে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়লে ঘাম হওয়ার প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয়। ফলে শরীর ঠিকমতো ঠান্ডা হতে পারে না। এ অবস্থায় দেহের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তারও বেশি হতে পারে।
এই অতিরিক্ত তাপমাত্রা মস্তিষ্কসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। তখনই দেখা দেয় হিট স্ট্রোকের লক্ষণ। আক্রান্ত ব্যক্তি বিভ্রান্ত আচরণ করতে পারেন, অসংলগ্ন কথা বলতে পারেন, এমনকি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন বা খিঁচুনি হতে পারে। এ সময় শরীর একেবারে ঘামহীন হয়ে যেতে পারে, হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। লিভার, কিডনি এবং পেশিসহ বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
হিট স্ট্রোকের আগের সতর্কবার্তাঃ
শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যখন ধীরে ধীরে ব্যর্থ হতে শুরু করে, তখন কিছু সাধারণ উপসর্গ দেখা যায়। অনেকেই এগুলোকে তেমন গুরুত্ব দেন না। যেমন- হালকা মাথাব্যথা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি। অনেক সময় মানুষ ধরে নেয় ঘুমের অভাব বা অন্য কোনো কারণে এসব হচ্ছে, ফলে সতর্ক হওয়ার সুযোগ হারিয়ে যায়।
প্রচণ্ড গরমে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, অবসন্ন লাগে। অনেকের বমিভাব হয়, এমনকি বমিও হতে পারে। মাথা ঘোরা, ঝিমঝিম ভাব বা মাথা হালকা লাগা, এসবও সাধারণ লক্ষণ।
এ সময় কাজের প্রতি মনোযোগ কমে যায়, বিরক্তি বেড়ে যায়। পেটে অস্বস্তি বা পেশিতে টান ধরতে পারে। অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, শরীর গরম হয়ে যাওয়া, ত্বক লালচে হয়ে ওঠা, এসব লক্ষণও দেখা যায়।
হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়া, তীব্র তৃষ্ণা লাগা এসবই পানিশূন্যতার ইঙ্গিত। প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে যাওয়া এবং পরিমাণ কমে যাওয়া এ অবস্থার আরেকটি লক্ষণ।
লক্ষণ দেখা দিলে কী করবেনঃ
হিট স্ট্রোক একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি। তাই এর আগের লক্ষণগুলোকে অবহেলা করা উচিত নয়। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রথমেই কাজ বন্ধ করে বিশ্রামে যেতে হবে এবং ঠান্ডা জায়গায় আশ্রয় নিতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। শরীর ঠান্ডা করতে মুখ, মাথা, ঘাড়ে পানি দেওয়া যেতে পারে।
ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে নেওয়া বা বগল, গলা, কুঁচকিতে বরফ বা ঠান্ডা ভেজা কাপড় রাখা শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমাতে সাহায্য করে।
বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে, হাতপাখা বা ছোট ফ্যান ব্যবহার করা যেতে পারে। আঁটসাঁট পোশাক ঢিলা করা বা কিছুটা খুলে দেওয়া উচিত, যেন শরীরে বাতাস লাগে।
অতিরিক্ত ঘাম হলে লবণ মিশ্রিত পানি, ওরস্যালাইন বা ইলেকট্রোলাইট পানীয় গ্রহণ করা উপকারী। ডাবের পানিও শরীরের জন্য ভালো কাজ করে।
কারা বেশি ঝুঁকিতেঃ
বয়স্ক মানুষ ও ছোট শিশুদের শরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক দুর্বল, তাই তাদের ঝুঁকি বেশি। তবে তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষরাও ঝুঁকিমুক্ত নন। বিশেষ করে যারা রোদে কাজ করেন বা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকেন, তাদের সতর্ক থাকা জরুরি।
প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় সুরক্ষাঃ
হিট স্ট্রোক প্রতিরোধ করা কঠিন নয়, প্রয়োজন শুধু সচেতনতা। গরমের সময় শরীর ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করুন এবং নিয়মিত পানি পান করুন। তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে কিছুক্ষণ পরপর পানি পান করা অভ্যাস করুন।
বাইরে বের হলে ছাতা ও পানি সঙ্গে রাখুন। প্রয়োজনে ছোট পাখা ব্যবহার করতে পারেন। মুখে পানি দেওয়া এবং ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছলে আরাম পাওয়া যায়।
পানির জন্য প্লাস্টিকের বোতলের বদলে থার্মোফ্লাস্ক ব্যবহার করলে পানি দীর্ঘ সময় ঠান্ডা থাকে। বোতলে আগে কিছু বরফ দিলে তা আরও কার্যকর হয়।
খাবারের ক্ষেত্রেও সচেতনতা জরুরি। ভারী ও তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে পানি সমৃদ্ধ খাবার বেছে নিন। ফলমূল, সবজি, ঝোলযুক্ত খাবার ও পাতলা ডাল শরীরকে হাইড্রেট রাখতে সাহায্য করে।
হালকা রঙের, ঢিলেঢালা পোশাক পরুন যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে। রোদের সময় বাইরে না যাওয়াই ভালো। প্রয়োজনে কাজের সময়সূচি এমনভাবে ঠিক করুন, যাতে তীব্র গরম এড়িয়ে চলা যায়।
সর্বোপরি, তীব্র গরমে নিজের পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদের দিকেও নজর রাখা জরুরি। শিশুদের রোদে অতিরিক্ত দৌড়ঝাঁপ করতে নিরুৎসাহিত করুন। যাদের পানি গ্রহণে সীমাবদ্ধতা আছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আমাদের চারপাশে অনেক মানুষ আছেন রিকশাচালক, ফেরিওয়ালা বা শ্রমজীবী, যারা রোদে কাজ করেন। তাদের জন্য পানি ও বিশ্রামের ছোট উদ্যোগও বড় সহায়তা হতে পারে।
পথের প্রাণী ও পাখিদের জন্যও পানি রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নিয়মিত পানি পরিবর্তন করুন এবং পরিষ্কার রাখুন। পাশাপাশি গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন, এটি পরিবেশ ঠান্ডা রাখতে সহায়ক।
সচেতনতা ও সামান্য যত্নই পারে হিট স্ট্রোকের মতো মারাত্মক ঝুঁকি থেকে আপনাকে এবং আপনার প্রিয়জনদের সুরক্ষিত রাখতে।