 |
| ছবিঃ সংগৃহীত । |
থাইরয়েড গ্রন্থি আমাদের গলার সামনের দিকে অবস্থান। এই গ্রন্থি থেকে থাইরক্সিন সহ বিভিন্ন হরমোন নিঃসরণ হয়। এসব হরমোন আমাদের শরীরে নানা রকম গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। বিপাক ক্রিয়ায় এসব হরমোনের বেশ বড় ভূমিকা রয়েছে।
তবে এই থাইরয়েড গ্রন্থিতে জন্ম থেকে শুরু করে যে কোন বয়সে বিভিন্ন রকম সমস্যা দেখা দিতে পারে। থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে কম হরমোন নিঃসরণ হয় সেটাকে আমরা হাইপোথাইরয়েডিজম বলি। এই ক্ষেত্রে থাইরয়েড গ্লান্ড থেকে সাধারনত কম পরিমাণ হরমোন তৈরী হয়। এরকম হরমোন শরীরে কম থাকলে আমাদের শরীরে নানা রকম প্রতিক্রিয়া এবং বিভিন্ন উপসর্গ দেখা যায়।
এসব উপসর্গের মধ্যে আছে দুর্বলতা, ক্লান্তি , মানসিক হতাশা, শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়া, ঘুম ঘুম ভাব হওয়া, ঠান্ডা বা শীত শীত লাগা, চামড়া ভারি ও শক্ত হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। সবার যে সব পর্যায়ে আবার একই রকম সমস্যা হবে তা কিন্তু নয়। একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম সমস্যা দিয়ে শুরু হয় । তবে একজন দক্ষ চিকিৎসক রোগীকে দেখে ও পরীক্ষা করে কিছুটা হাইপোথাইরয়েডের আভাস পান।
এর জন্য বিভিন্ন রকম ল্যাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। রুগীর শরীরের হরমোন আসলে কমে গেছে কিনা বা কি কারনে কমেছে তার জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে। পরীক্ষায় এই হরমোনগুলো মাপা যায় এবং বোঝা যায় যে তার শরীরে হরমোন কমে গেছে কিনা বা কমলে কি তার কারন। আর যদি দেখা যায় যে হরমোন কমে গেছে তখন কি কারণে হরমোন কমে গেছে সেটি বের করার চেষ্টা করা হয় ।
চিকিৎসার জন্য যেই হরমোনটা কম তার ওষুধ থাইরক্সিন খেয়ে যেতে হয়। এই ট্যাবলেট সাধারণত সকালে বাসি পেটে খেয়ে যেতে হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে খেতে হতে পারে। ৩ থেকে ৬ মাস পর পর আবার হরমোন পরীক্ষা করে দেখতে হয় যে শরীরে হরমোন ঠিক মত আছে কিনা। সবার জন্য কিন্তু চিকিৎসার ডোজ এক নয় কারো ক্ষেত্রে একটি ট্যাবলেট লাগে কারো ক্ষেত্রে দুইটি কারো ক্ষেত্রে তিনটি কারো ক্ষেত্রে চার-পাঁচটি লাগতে পারে। কতটুকু চিকিৎসা লাগবে সেটা একজন চিকিৎসক বা এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট ঠিক করবেন। অন্যেরটা দেখে বা দোকানদারের কথায় বাড়ানো কমানো বা বন্ধ করে দেয়া বিপদজনক। আমাদের দেশে রুগীদের বিপদ ডেকে আনতে স্বল্প শিক্ষিত দোকানদাররা বা হাতুরে ডাক্তাররা হরমোনের, উচ্চ রক্তচাপের, ডায়াবেটিসের, হাঁপানীর, হার্টের বিভিন্ন ওষুধ কমিয়ে বাড়িয়ে দেয় বা বন্ধ করে দেয়।
থাইরয়েড গ্রন্থিতে আরেকটি বড় সমস্যা দেখা যায়। সেটা হচ্ছে থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে বেশি বেশি হরমোন নিঃসরণ হয়। গ্রন্থি থেকে হরমোন নিঃসরণ যদি বেড়ে যায় তখন আবার নানারকম উপসর্গ দেখা যায়। এর ফলে শরীরে অস্থিরতা জাগে। বুক ধরফর করে। পাতলা পায়খানা হয় এবং মাসিকে অনিয়ম হয়। শরীরের ওজন কমে গিয়ে শুকিয়ে যেতে থাকে। হাত পা কাঁপতে থাকে এবং ঘাম হয়। এবং অনেকে এই তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে না। এক্ষেত্রে হরমোন টেস্ট করলে রোগটি ধরা পড়ে এবং তারপরে হরমোন কমানোর জন্য বিভিন্ন ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয়। এই ক্ষেত্রে কখনও কখনও রেডিওথেরাপি এবং সার্জারির কিছু ভূমিকা আছে। তবে কার জন্য কি চিকিৎসা লাগবে সেটা একজন চিকিৎসককে দেখিয়ে ঠিক করবেন।
থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে বিভিন্ন ক্যান্সারও হতে পারে। সবচেয়ে বেশি যে ক্যান্সার দেখা যায় সেটা হচ্ছে প্যাপিলারি কার্সিনোমা। এই ক্যান্সারের ভালো চিকিৎসা আছে। এছাড়া ফলিকুলার কার্সিনোমা এবং এনাপ্লাস্টিক কার্সিনোমাও হয়। এদের মধ্যে আনাপ্লাস্টিক সবচেয়ে খারাপ ক্যান্সার। আশার কথা হচ্ছে বিভিন্ন ক্যান্সারের ভালো চিকিৎসা এখন আমাদের দেশে আছে এবং এগুলো বেশ সহজে চিকিৎসা করা সম্ভব।
থাইরয়েডের মধ্যে অনেক সময়ে কারও কারও প্রদাহ হতে পারে। একে থাইরয়েডাইটিস বলে। বিভিন্ন ইনফেকশনের কারণে এই প্রদাহ হয়। বিভিন্ন ভাইরাস এর জন্য দায়ী। ফলে হরমোনের তারতম্যের সৃষ্টি হয়। তবে সাধারণত এগুলো ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন হরমোন ওষুধ খেতে হয় না।
থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে গেলে সেটাকে আমরা গয়টার বলি। এটা হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে আয়োডিনের অভাব। আয়োডিনের অভাবে গয়টার হয়। গয়টার হলে অনেক সময় গলায় ব্যথা হয় গলাতে ফোলাভাব থাকে এবং কারও কারও খাবার গিলতেও সমস্যা হয়। কাশি বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে। তবে এরও ভালো চিকিৎসা আছে। এরকম হলে একজন এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট এর পরামর্শ নেবেন।
তাই দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন অসুখ থাইরয়েড গ্লান্ডে হতে পারে। সবকিছু নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো। আশা করি সবারই থাইরয়েড এর বিভিন্ন অসুখ সম্বন্ধে একটা ধারণা সৃষ্টি হল। এসবের কোন লক্ষন বা সন্দেহ হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।
-সংগৃহীত ।